- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
আমার বিয়ের মাস খানেক যেতেই আমার চাচী শাশুড়ি একদিন আড়ালে ডেকে আমায় বললেন,' বউ, তোমার শাশুড়ি মানুষ কেমন? খুব ভালো তাই না? '
আমি বললাম,' জ্বি। ভীষণ ভালো। এমন মাটির মানুষ হয় না জগতে।'
আমার চাচী শাশুড়ি ঠোঁট ভেঙে হাসলেন। এরপর বললেন,' কেমনে বুঝলা সে মানুষ ভালো?'
আমি বললাম,' উনি আমার সঙ্গে কখনোই বাজে আচরণ করেননি। আমাকে তিনি নিজের মেয়ের মতো দেখেন। বিয়ের তো এক মাস হয়েছে। এখনও রান্নাঘরে গিয়ে তেমন কাজ করতেই দিলেন না। রান্নাঘরে গেলে বলেন, সারা জীবনই কাজ করতে পারবা মা। এখন তুমি নতুন বউ।রংঢং করো। রান্নাটা আমাকেই করতে দাও।আমি যেদিন ঘরে পড়ে যাবো সেইদিন থেকে তুমি ঘরের সব দায়িত্ব হাতে তোলে নিবা মা! এতো কিছু করার পরেও তাকে ভালো মানুষ বলবো না তো কাকে ভালো মানুষ বলবো বলুন?'
আমার চাচী শাশুড়ি আরেকবার হাসলেন।চোরা হাসি। হেসে বললেন,' তোমার শাশুড়িরে তাইলে তুমি চেনো না। সে হইলো এক নম্বরের মেনি মুখো।'
আমি অবাক হলাম। বললাম,' মেনি মুখো মানে?'
আমার চাচী শাশুড়ি বললেন,' সময় হলেই বুঝবা। জ্বালিয়ে মারবে তোমারে।ওর আসল লোভ অন্য জায়গায়।তোমারে হাত করে সে তোমার থেকে বিরাট ফায়দা হাসিল করবো।বুঝলা? গোপন খবরটা আমি জানি।'
আমি এবার আরো অবাক হলাম। গোপন খররটা কি আসলে তা জানতে খুব মন চাচ্ছে।আমি জিজ্ঞেস করলাম। বললাম,' গোপন খবরটা কি বলুন তো চাচী!'
আমার চাচী শাশুড়ি বললেন, ' আজ না। অন্যদিন বলবো।একদিনে সব বলা যাবে না। তুমি আমার কাছে আরেকদিন সময় করে আইসো। খুব গোপনে কিন্তু আসবা। তোমার শাশুড়ি কিন্তু খুব চতুর।সব খেয়াল রাখে। সাবধান!'
আমি বললাম,' কিচ্ছু জানবে না।উনি বাড়ি থেকে বের হলেই আসবো ।'
এর আরো সপ্তাহ খানিক পর আমার শাশুড়ি তার বোনের বাড়ি বেড়াতে গেলেন। বোনের স্বামীর অসুখ। দেখতে গিয়েছেন। সেদিন আবার চাচী শাশুড়ির কাছে গেলাম।চাচী শাশুড়ি এ কথা সে কথা বলতে বলতে এক সময় গোপন কথাটা বললেন। বললেন,' তুমি এক বাপের এক মাইয়া তাই তো?'
আমি বললাম,' জ্বি।'
চাচী শাশুড়ি এবার বললেন,' তোমার বাপের বহুত সহায় সম্বল আছে।শহরে জায়গা আছে।তাই না?'
আমি বললাম,' জ্বি আছে।'
তিনি এবার বললেন,' তোমারে ভুলিয়ে ভালিয়ে এইসব কিছু সে তার ছেলের হস্তগত করবো। ছেলের নামে লিখিয়ে নিবো।বুঝলা? আসল কাহিনী হইলো এইটা। তোমার শাশুড়ি এই চক্রান্ত আগেই করেছে।আমি জানি। ছেলের সঙ্গে তার ফিসফিসানি মাঝেমধ্যে আমরাও শুনি। বুঝলা!'
আমি কি বলবো কিছুই বুঝতে পারছি না। কিন্তু আর দশজন মানুষের মতোই তো আমি।মনে শয়তান কেমন যেন নানান সংশয়ের সৃষ্টি করতে শুরু করলো।আমি ভাবতে লাগলাম, আমার চাচী শাশুড়ির কথা হয়তো সত্যি। আমার শ্বাশুড়ি নয়তো এতো ভালো ব্যবহার করবেন কেন? সবাই তো বলে ছেলের বউদের সঙ্গে শ্বাশুড়িদের সম্পর্ক বড়া বড়ই খারাপ হয়। কিন্তু তিনি এতো ভালো আচরণ করেন কেন আমার সঙ্গে? তিনি হয়তো ভালো মানুষের মুখোশ পরে আমার থেকে ফায়দা হাসিল করতে চান।
এই যে সংশয় ভেতরে ঢুকলো তা দিন দিন বেড়েই চলছে। এখন আর শাশুড়িকে আমার ভালো লাগে না। তিনি আমায় ' মা মা ' বলে ডাকেন।আদর করেন। কিন্তু আমার এসব অসহ্য লাগে।রাগ উঠে যায় একেকবার।
এরপর একদিন বাড়ি গেলাম বেড়াতে। বাবার কাছে সবকিছু খুলে বললাম। বললাম,' বাবা, আমার চাচী শাশুড়ি আমায় এই কথাগুলো বলেছেন। আমার শাশুড়ির উদ্দেশ্য খুব খারাপ! উনি আমাদের সব সম্পত্তি ভোগ করতে চান!'
বাবা শুনে হাসলেন। বললেন,' তুমি তোমার সর্বনাশ করতে চলেছো জবা! কাজটা তুমি ভালো করো নাই মা! '
আমি অবাক হলাম। বললাম,' আমি কি করেছি আবার?'
বাবা বললেন,' এই যে তৃতীয় পক্ষের কথা কানে নিলা! এই কথা কানে নেবার আগে তোমার মনে শান্তি ছিল খুব তাই না? শাশুড়িকে নিজের মায়ের মতো মনে হতো না তোমার?'
আমি খানিক সময় চুপচাপ থেকে ভাবলাম। তারপর বললাম,' জ্বি বাবা।মনে হতো।শান্তি লাগতো। এখন সব অসহ্য লাগে। উনার চেহারা দেখলেই মাথা গরম হয়ে উঠে!'
বাবা আমার একটা হাত ধরলেন। তারপর বললেন,' মারে, এই যুগে শাশুড়ির আদর পাওয়ার ভাগ্য মানুষের কপালে সহজে জুটে না। এই ঘটনা বিরল।আমি খুব যাচাই-বাছাই করে তোমার জন্য এই বিয়ের জোগাড় করেছি। তোমার তাক্বদীর বড় ভালো মা। তুমি পরের কথা শুনে তোমার কপাল পোড়ো না। মানুষ কখনোই কারোর সুখ দেখতে পারে না। তোমার চাচী শাশুড়িও তোমার সুখ দেখতে পারছে না। তাছাড়া তোমার শাশুড়িই বা এই জমি তার ছেলের জন্য লিখিয়ে নিবেন কেন? কি প্রয়োজন তার? তার নিজের কম আছে? আর তোমার তো কোন ভাই বোন- নাই। এমনিতেই এইসব কিছু তোমার।আর তোমার যা, তা তো তোমার স্বামীরই।আর তোমার স্বামীর যা আছে তাও তো তোমার। তাহলে আর এসব নিয়ে কথা কি? মনের ভেতরের শয়তানি, নোংরামি, কপটতা সব ঝেড়ে ফেলে দাও মা। তবেই দেখবা জীবন সুন্দর।পৃথিবী সুন্দর।দেখবা, তখন জীবনে সুখ আর সুখ। কোন সমস্যা নাই আর জীবনে! '
বাবার কথা আমার মনে ধরলো।
শ্বশুর বাড়িতে আবার ফিরে এলাম।বাড়ি থেকে আসার পর আমার চাচী শাশুড়ি আবার ডেকে নিলেন আমায়। আবার নানান কথা বলতে শুরু করলেন আমার শাশুড়ির বিরুদ্ধে।আমি তখন প্রতিবাদ করলাম। বললাম, ' আমার কাছে এসব বলছেন কেন? আমার মায়ের বিরুদ্ধে আমার কাছেই এসব বাজে বাজে কথা বলছেন আপনি! আপনার সাহস তো কম না!'
আমার চাচী শাশুড়ি আমার কাছ থেকে এরকম আচরণ আশা করেননি। তিনি কেমন দমে গেলেন। এরপর আর কোনদিনই তিনি আমার কাছে আমার শাশুড়ির বিরুদ্ধে একটি কথা বলারও সাহস করেননি।
'
জীবন হয়তো কারো কারোর জন্য ভীষণ সুন্দর হয়। কারোর কারোর শাশুড়ি ভাগ্য খুব ভালো হয়। আমার ভাগ্যও এমন।প্রতি মাসেই নারীদের যে বিশেষ কয়টি দিন আছে তখন আমার খুব কষ্ট হতো।ব্যথায় কাতর হয়ে যেতাম আমি। আমার শাশুড়ি মা তখন আমায় বিছানা থেকেই নামতে দিতেন না। আমার সেবাযত্ন করতেন তিনি। মুখে নলা তুলে খাইয়ে দিতেন তিনি। মানুষ এসব দেখে হিংসা করতো। কিন্তু কিছু বলতে সাহস করতো না।
আমার যখন প্রথম সন্তান হলো। আমার পেছনে কতো খাটাখাটুনি যে তিনি করেছেন তা আমি জানি আর আল্লাহ জানেন! এতো ভালো মানুষ কখনো হয় জগতে? আমার বড় অবাক লাগতো।আমি ভাবতাম এ বুঝি এক গল্পের জগত! নাটক সিনেমার জগত! কিন্তু কারোর কারোর জীবন গল্প নাটকের চেয়েও তো সুন্দর হয়। হয়তো আমিও তেমনই।
আমার শাশুড়ি মারা গেলেন আমার বিয়ের আট বছর পর। তার মৃত্যুর সময় কোন রকম কষ্ট হয়নি তার।বয়স হয়েই পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি। কিন্তু রোগ নিয়ে তাকে দীর্ঘদিন ধরে ভুগতে হয়নি।
তিনি মারা গেলেন সামান্য জ্বরে।হুট করে জ্বর হয়েছে।দু তিনদিন একটানা জ্বর। সেই জ্বর আর কমে না। একদিন দুপুর বেলা তার শরীর খুব খারাপ হলো।আমি আর আমার স্বামীকে তখন ডাকলেন তিনি।আমরা কাছে গেলে বললেন বসো।আমরা বসলাম। এরপর তিনি আমায় বললেন,' মা, আমার আঁচল থেকে চাবিগুলা খুলে নেও।এখন খুলো।'
আমি মার আঁচল থেকে চাবি খুলে নিলাম।
এরপর তিনি বললেন,' আজ থেকে সব তোমার।এই ঘর, এই সংসার, আমার ছেলে, সবকিছুই তোমার আমানতে।একটা ভালো নারীই পারে মা একটা ঘরকে বেহেশতের মতো করে রাখতে। তুমি বড় ভালো মেয়ে। তুমি পারবে। তোমার উপর আমার ভরসা আছে।'
সেদিনই মা মারা গেলেন। তার মৃত্যুর পর দেখলাম তিনি আমার জন্য কতো কি যে রেখে গেলেন। আলমারি ভর্তি নানান জিনিস।স্বর্ণের অলঙ্কার। সুন্দর পরিপাটি সংসার। সবকিছু।
জীবন সত্যিই সুন্দর।সত্যিই সংসার বেহেশতের মতো।যদি এতে তৃতীয় পক্ষ এসে নাক গলানোর কোন সুযোগ না পায় তবেই!
শ্বাশুড়িভাগ্য
অনন্য শফিক
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন