- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
মেঘার জন্য অপেক্ষা
নাম ছিল অর্ণব। কলকাতার একটা পুরনো বাড়িতে থাকত। বাবা-মা দুজনেই চাকরিজীবী, তাই ছোটবেলা থেকেই সে একা একা সময় কাটাত। স্কুলে সে খুব ভালো ছাত্র ছিল না, কিন্তু গল্প লেখার ভীষণ নেশা ছিল। খাতার পাতায় পাতায় সে অজানা মেয়েদের নিয়ে গল্প লিখত—কখনো বৃষ্টির দিনে ছাতা ভাগাভাগি, কখনো ট্রেনে চোখাচোখি। কেউ জানত না, সে আসলে নিজের জন্যই একটা স্বপ্নের প্রেমিকা তৈরি করে রেখেছে।
আর ওদিকে ছিল মেঘা।
মেঘা থাকত হাওড়ায়। বাবা ছিলেন রেলওয়ে কর্মচারী, মা গৃহিণী। মেঘা ছোটবেলা থেকেই খুব চুপচাপ। স্কুলে সে প্রথম হত, কিন্তু কখনোই কাউকে নিজের কথা বলত না। তার একমাত্র বন্ধু ছিল তার ডায়েরি। সেখানে সে লিখত—
“আজ আবার বৃষ্টি হচ্ছে। কেউ যদি আমার পাশে দাঁড়িয়ে এই বৃষ্টি দেখত...”
দুজনের দেখা হল একটা বইমেলায়।
অর্ণব সেদিন “প্রেমের গল্প” খুঁজছিল। মেঘা দাঁড়িয়েছিল একটা পুরনো কবিতার বইয়ের সামনে। অর্ণব যখন হাত বাড়িয়ে বইটা নিতে গেল, মেঘার হাতও এসে পড়ল সেখানে। দুজনেই চমকে উঠল।
অর্ণব হাসল, “সরি... আপনিও এই বইটা নিতে চেয়েছিলেন?”
মেঘা মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ... সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের।”
অর্ণব বলল, “তাহলে আপনিই নিন। আমি অন্যটা দেখে নেব।”
মেঘা চুপ করে রইল। অর্ণব তখন একটা ছোট্ট কথা বলে ফেলল, “আপনার নাম কী?”
“মেঘা।”
“আমার অর্ণব। মেঘা আর অর্ণব... একটু মজার মিল আছে না?”
মেঘা প্রথমবার হাসল। সেই হাসি অর্ণবের খাতার সব গল্পকে হার মানিয়ে দিল।
সেদিন থেকেই শুরু।
তারা প্রথমে শুধু মেসেজে কথা বলত। অর্ণব লিখত লম্বা লম্বা চিঠি—যেন কোনো উপন্যাসের পাতা। মেঘা উত্তর দিত ছোট করে, কিন্তু প্রতিটা শব্দে ভালোবাসা লুকিয়ে থাকত। একদিন অর্ণব লিখল—
“মেঘা, তুমি কি কখনো ভেবেছ যে দুজন মানুষ কতদূর থেকে এসে একে অপরকে খুঁজে পায়?”
মেঘা উত্তর দিল—
“ভেবেছি। আর ভেবেছি, যদি সত্যিই খুঁজে পাই, তাহলে আর হারাতে চাই না।”
প্রথম দেখা হল গঙ্গার ধারে। সন্ধ্যেবেলা। অর্ণব এল হাতে একটা ছোট্ট গোলাপ নিয়ে। মেঘা এল হালকা নীল শাড়িতে। দুজনেই খুব নার্ভাস। কথা কম হল। শুধু বসে থাকল। নদীর জল বয়ে চলছিল, আর দুজনের হৃদয়ও।
একসময় অর্ণব হাত বাড়িয়ে মেঘার হাত ধরল। মেঘা সরাল না।
সেদিন রাতে মেঘা ডায়েরিতে লিখল—
“আজ প্রথমবার কারো হাত ধরেছি। আর মনে হচ্ছে, এই হাত আজীবন ধরে রাখতে চাই।”
সময় কেটে গেল। দুজনেই কলেজে উঠল। অর্ণব ইংরেজি অনার্স পড়তে লাগল, মেঘা ইতিহাস। তারা প্রায় প্রতি সপ্তাহে দেখা করত। কখনো কফি হাউসে, কখনো পার্ক স্ট্রিটে, কখনো আবার সেই গঙ্গার ধারে।
একদিন বৃষ্টির মধ্যে তারা ভিজে গেল। অর্ণব নিজের জ্যাকেট মেঘাকে দিয়ে দিল। মেঘা বলল, “তুমি নিজে ভিজছ...”
অর্ণব হাসল, “তুমি শুষ্ক থাকলেই আমার সব ঠিক।”
মেঘা চুপ করে অর্ণবের কাঁধে মাথা রাখল। সেদিন প্রথম চুমু হল। বৃষ্টির ফোঁটায় ভেজা ঠোঁটে। কোনো কথা ছিল না। শুধু একটা অনুভূতি—যেন পৃথিবী থেমে গেছে।
কিন্তু প্রেম কখনোই শুধু সুখের হয় না।
মেঘার বাবা জানতে পারলেন। তিনি খুব রক্ষণশীল মানুষ। বললেন, “এখন পড়াশোনা। প্রেমের সময় নয়।” মেঘাকে বাড়ি থেকে বেরোতে নিষেধ করা হল। ফোন কেড়ে নেওয়া হল।
অর্ণব পাগলের মতো খোঁজ করত। মেসেজ পাঠাত, কল করত—কোনো উত্তর নেই। একদিন সে হাওড়ায় মেঘার বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বৃষ্টি হচ্ছিল। সে ভিজে কাপড়ে দাঁড়িয়ে রইল ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
মেঘা জানালার ফাঁক দিয়ে দেখল। তার চোখে জল। কিন্তু বাবার ভয়ে বেরোতে পারল না।
রাত্রিবেলা মেঘা একটা চিঠি লিখল। পাশের বাড়ির ছেলেকে দিয়ে অর্ণবের হাতে পৌঁছে দিল। চিঠিতে লেখা—
“অর্ণব, আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু এখন পারি না। তুমি অপেক্ষা করো। আমি ফিরে আসব। প্রতিজ্ঞা করছি।”
অর্ণব সেই চিঠি বুকের কাছে রেখে দিল। সে লেখা থামিয়ে দিল না। প্রতিদিন একটা করে চিঠি লিখত, যদিও পাঠাতে পারত না। খাতা ভরে উঠল মেঘার নামে।
দুবছর কেটে গেল।
মেঘা স্নাতক শেষ করল। বাবা কিছুটা নরম হলেন। মেঘা চাকরি পেল একটা পাবলিশিং হাউসে। প্রথম বেতন পেয়েই সে অর্ণবকে খুঁজতে বেরোল।
অর্ণব তখন একটা ছোট্ট ম্যাগাজিনে কাজ করত। মেঘা যখন অফিসের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, অর্ণব তাকে চিনতে পারল না প্রথমে। মেঘা বদলে গিয়েছিল—আরও পরিণত, আরও সুন্দর।
মেঘা হাসল, “অর্ণব... চিনতে পারছ না?”
অর্ণবের হাত কাঁপতে লাগল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। কোনো কথা বলল না। শুধু মেঘাকে জড়িয়ে ধরল। দুজনেই কেঁদে ফেলল। রাস্তার মানুষ তাকিয়ে দেখল, কিন্তু তাদের কিছু এল না।
সেইদিন সন্ধ্যায় তারা আবার গঙ্গার ধারে গেল। অর্ণব বলল, “তুমি প্রতিজ্ঞা রেখেছ। আমিও অপেক্ষা করেছি।”
মেঘা বলল, “এবার আর কাউকে আলাদা করতে দেব না।”
তারপর শুরু হল তাদের নতুন জীবন।
তারা বিয়ে করল। খুব সাধারণ বিয়ে। শুধু পরিবার আর কয়েকজন বন্ধু। বিয়ের রাতে অর্ণব মেঘাকে একটা খাতা দিল। সেই পুরনো খাতা, যেখানে সে দুবছর ধরে প্রতিদিন চিঠি লিখেছিল।
মেঘা পাতা উল্টাতে উল্টাতে কেঁদে ফেলল। শেষ পাতায় লেখা ছিল—
“মেঘা, যদি তুমি কোনোদিন ফিরে আসো, তাহলে জেনে রেখো—আমি প্রতিদিন তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি। আর যদি নাও আসো, তাহলেও... আমি তোমাকে ভালোবেসেই মরব।”
মেঘা অর্ণবের বুকে মুখ লুকিয়ে বলল, “আমি এসেছি। আর আর কখনো যাব না।”
বছর গেল। তাদের একটা মেয়ে হল। নাম রাখল “বৃষ্টি”। কারণ তাদের প্রথম চুমু হয়েছিল বৃষ্টিতে।
অর্ণব এখন একজন পরিচিত লেখক। তার সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাসের নাম—“মেঘার জন্য”। আর মেঘা সেই পাবলিশিং হাউসের এডিটর।
একদিন রাতে, অর্ণব আর মেঘা বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল। বৃষ্টি পড়ছিল। মেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
অর্ণব বলল, “জানো মেঘা, আমি কখনো ভাবিনি যে স্বপ্নের গল্প সত্যি হতে পারে।”
মেঘা তার হাত ধরে বলল, “আর আমি কখনো ভাবিনি যে কেউ এতদিন অপেক্ষা করতে পারে।”
অর্ণব হাসল, “ভালোবাসা তো অপেক্ষাই। আর তুমি আমার অপেক্ষার শেষ।”
বৃষ্টির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। দূরে কোনো ট্রেনের হুইসেল। আর দুজন মানুষ, যারা একসময় হারিয়ে গিয়েছিল, এখন পাশাপাশি বসে আছে—চিরকালের মতো।
এই গল্পের শেষ নেই। কারণ প্রেমের গল্প কখনো শেষ হয় না। শুধু পাতা উল্টে যায়। আর প্রতিটা পাতায় থাকে একই কথা—
“আমি তোমাকে ভালোবাসি। আজও। কালও। চিরকাল।”
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন